কাঁচের ভেতরে তথ্য সংরক্ষণের এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি যা পালটে দেবে তথ্য সংরক্ষণের সম্পূর্ণ চিন্তাধারাকে।

আপনি কি জানেন আমাদের মহাবিশ্বের বয়স কত? প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর। আর আমাদের প্রিয় পৃথিবীর বয়স? প্রায় ৫ বিলিয়ন বছর। এই ৫ বিলিয়ন বছরের পৃথিবীর কতটুকু ইতিহাস আমরা জানতে পেরেছি বা সভ্যতার কতটুকু নিদর্শন আমরা অক্ষত অবস্থায় পেয়েছি? ০.১%-ও না। কিন্তু কেমন হত যদি আমাদের কাছে তথ্য সংরক্ষণের এমন কোন পদ্ধতি থাকতো যা অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীর বয়সকেও ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম? ১০০০০ বছর পরেও আমাদের কোন প্রজন্ম আমাদের সম্পর্কে সবকিছু জানতে পারতো? সেরকম এক প্রযুক্তি এখন স্বপ্ন থেকে বাস্তব হবার পথে। আর সেটা হল কাঁচ বা কাঁচের ভেতরে তথ্য সংরক্ষণের পদ্ধতি।

২০১৩ সালে ইউকে ইউনিভার্সিটি অফ সাউথহ্যাম্পটনের একদল গবেষক সফলভাবে কাঁচে 5D স্পেসে তথ্য সংরক্ষণের ও পুনরুদ্ধারের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন যা ডেটা স্টোরেজের গতানুগতি চিন্তাধারায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। এমন এক কাঁচের ডিস্ক যা বাজারে কিনতে পাওয়া সিডি ডিস্কের তুলনায় ৩০০০ গুণ বেশি তথ্য ধারণ করতে পারে। একটা সাধারণ ব্লু-রে ডিস্কের ধারণ ক্ষমতা ১২৮ গিগাবাইট, একই সাইজে একটি গ্লাস ডিস্কের এস্টিমেটেড ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৩৬০ টেরাবাইট। তাদের গবেষণায় বলা হয় এই ডিস্ক ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পর্যন্ত অক্ষত থাকতে পারে, অর্থাৎ পৃথিবীর নিজের বয়সের থেকেও বেশি।

এটি একেবারে নতুন প্রযুক্তি না। অনেকেই এতদিনে জেনে গেছেন যে বিজ্ঞানীরা কাঁচ এবং DNA স্টোরেজ নিয়ে কাজ করছে বেশ কিছুদিন থেকে। বিলিয়নে লাইফটাইমের হিসাব বা টেরাবাইটে ধারণ ক্ষমতার হিসাবের মত থিওরি অনেকেরই এখন জানা। কিন্তু এসবের বাস্তব অগ্রগতি কতদূর? আর কেনই বা দরকার এমন প্রযুক্তির?

এক এস্টিমেশন অনুযায়ী বলা হয় বর্তমানে ইন্টারনেটে ক্লাউড স্টোরেজের ধারণ ক্ষমতা ২০০০ এক্সাবাইট (২ বিলিয়ন টেরাবাইট)। এভাবে শুনলে মনে হতে পারে এটা এক বিশাল স্টোরেজ। কিন্তু বাস্তবে আসলে চিত্র ভিন্ন। শুধু ইউটিউবের কথাই চিন্তা করলে দেখা যায় প্রতি মিনিটে ইউটিউবে প্রায় ৫০০ ঘন্টার কন্টেন্ট আপলোড করা হয়। প্রযুক্তির উন্নয়নের পথে এখন দিন দিন সবকিছু ক্লাউডভিত্তিক হয়ে যাচ্ছে। শুধু পারসোনাল ফালই নয়, বিভিন্ন সিকিউরিটি ফাইল, মেডিকেল রেকর্ড, ক্রিমিনাল রেকর্ড, পাবলিক ডেটা ইত্যাদি সব কিছুরই ঠিকানা এখন ক্লাউড। আর তাই বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদী ডেটা ধারণকারী ডিভাইসের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কারণ যদি নতুন কোন স্টোরেজ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করা না হয় ধারণা করলে দেখা যায় একদিন না একদিন ইন্টারনেটের সকল স্পেস শেষ হয়ে যাবে, তা হোক আরও শত বছর পরে বা তারও পরে। সেই সাথে আর্কাইভ ডেটার জন্য বর্তমানের কোন ডিজিটাল সল্যুশন কোন ভাবেই উপযুক্ত নয়, তাদের জন্যও নতুন প্রযুক্তির দরকার হবে ভবিষ্যতে। ধারণা করা হচ্ছে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন ক্লাউড স্টোরেজে সংরক্ষিত ডেটার পরিমাণ ১০০ জেটাবাইট ছাড়িয়ে যাবে (১ জেটাবাইট = ১০০ কোটি টেরাবাইট)। এত বিশাল আকারের ডাটাকে সুরক্ষিতভাবে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করার জন্য স্টোরেজ ডিভাইস নিয়ে চিন্তার শেষ নেই বড় বড় টেক জায়ান্টগুলোর। অনেক কোম্পানি নতুন নতুন স্টোরেজ সল্যুশন নিয়ে রিসার্চ করে চলেছে। মাইক্রোসফট কাজ করছে এমনই এক সল্যুশন নিয়ে যার নাম প্রজেক্ট সিলিকা। কেমব্রিজে মাইক্রোসফট রিসার্চ ল্যাবে চলছে এই প্রজেক্টের সকল গবেষণা।

বর্তমানের সমস্যা, ভবিষ্যতের সল্যুশনঃ

বর্তমান সময়ে আমাদের হাতে যেসব ডেটা সংরক্ষণ করার টেকনোলজি বা পদ্দতি রয়েছে সেগুলো যথেষ্ট এডভান্স, আকারে ছোট, উচ্চ ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন। কিন্তু এতকিছুর পরেও দীর্ঘসময় তথ্য ধারণ করার ক্ষেত্রে কোন মাধ্যমই উপযুক্ত না। ম্যাগনেটিক স্টোরেজ ডিভাইস অর্থাৎ ম্যাকানিকাল হার্ডডিস্ক অথবা ফ্ল্যাশ স্টোরেজ ডিভাইস অর্থাৎ সলিড স্টেট ড্রাইভ এগুলো সবই দীর্ঘ সময় তথ্য ধারণ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অনির্ভরযোগ্য। কারণ বর্তমান ডিজিটাল স্টোরেজ সিস্টেমে ধারণকৃত তথ্য সময়ের সাথে সাথে ক্ষয় হয়ে যায় বা হারিয়ে যেতে থাকে। এজন্য এসব তথ্যকে নিয়মিত আপডেট, রি-রাইট করতে হয়। আবার যেসব ড্রাইভে তথ্য সংরক্ষিত আছে সেসব ড্রাইভেরও নিজস্ব জীবনকাল রয়েছে, যা সীমিত, তাই তথ্য হালনাগাদের পাশাপাশি নিয়মিত ড্রাইভ মাইগ্রেটেরও (নতুন ড্রাইভে স্থানান্তর) প্রয়োজন পড়ে। এসব ড্রাইভ ডেটা রিড বা রাইটের সময় যথেষ্ট তাপ উৎপন্ন করে, অতি নিম্ন তাপমাত্রায় এগুলোর কার্যক্ষমতা কমে যায় আবার অতি উচ্চ তাপমাত্রায়ও একই অবস্থা হয়। বাহিরের ধূলাময়লা থেকে এদের যথেষ্ট ক্ষতি হতে পারে, পানিতে ভিজলেও নষ্ট হয়ে যায়, স্ক্র্যাচ বা আঘাত লাগলে ডেটা বা ডিভাইস নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালস বা মাইক্রোওয়েভের সংস্পর্শে এলেও যথেষ্ট ক্ষতি হয়। তাই এগুলোর সর্বাধিক কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও পরিবেশে এগুলোকে অপারেট করা হয়। সব মিলিয়ে যা যথেষ্ট ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদী তথ্য সংরক্ষণে অনুপোযোগী। লাইফটাইম বিবেচনা করলে দেখা যায় ডিজিটাল স্টোরেজের তুলনায় প্লাস্টিক ফিল্ম বা কাগজের লাইফটাইম বেশি, কিন্তু সিমাবদ্ধতাও অন্য সবগুলো ক্ষেত্রে থেকে যায়।

এই সকল সমস্যার সমাধান হিসেবে তথ্য ধারণের জন্য বিজ্ঞানীরা বেছে নিয়েছেন কাঁচকে, যা উপরের সবগুলো সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে। উচ্চ বা নিম্ন তাপে কাঁচের কিছু হয়না, পানিতে ভিজলেও কিছু হয়না, মাইক্রোওয়েভ বা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালসেও কিছু হয়না, ধূলা ময়লা বা স্ক্র্যাচ পড়লেও কাঁচের ভেতরের ডেটার কিছুই হবেনা। হাজার হাজার বছর তথ্য সংরক্ষণের জন্য কাঁচ তাই হতে পারে সর্বোত্তম সমাধান।

প্রজেক্ট সিলিকা কি?

প্রজেক্ট সিলিকা হল কাঁচের মধ্যে তথ্য সংরক্ষণের একটি প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিতে একটি কোয়ার্টজ গ্লাস শিটের ভেতরে ফেমটোসেকেন্ড পালস লেজার দিয়ে খোদাই করে ডাটা রাইট করা হয় (১ ফেমটোসেকেন্ড = ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ কোটি ভাগের ১ ভাগ, ডাটা রাইট করার জন্য ১০০ ফেমটোসেকেন্ড পালস ব্যবহার করা হয়)। লেজার দিয়ে কাঁচের শিটের ভেতরে ফোকাস করা হয়, লেজার যেখানে ফোকাস করে সেই স্থানে কাঁচে স্থায়ীভাবে একটি ভক্সেল তৈরি হয় বা সহজ কথায় বললে আঁচড় পড়ে যায়। এই প্রসেসকে ন্যানোগ্রেটিং বলে আর এই ন্যানোগ্রেটিং-এ প্রত্যেক পালসে একটি করে ১ ন্যানোমিটার আকারের ভক্সেল তৈরি হয়। কম্পিউটারের ভাষায় ভোক্সেল বলতে ত্রিমাত্রিক রেফারেন্স মডেলের সমবন্টিত গ্রিডে একটি একক ডাটা পয়েন্ট বা স্যাম্পলকে বুঝায়, এই ডাটা পয়েন্টে এক বা একাধিক তথ্য সংরক্ষিত থাকতে পারে। কাঁচের ভেতর প্রত্যেক ভক্সেলের একটি নির্দিষ্ট দিক এবং নির্দিষ্ট গভীরতা আছে, যার উভয়ই লেজার দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যার ফলে বিভিন্ন ভক্সেল বিভিন্ন গভীরতার এবং বিভিন্ন দিকে মুখ করে থাকতে পারে। এই দিক ও গভীরতার উপর ভিত্তি করে প্রতিটি ভক্সেলে একাধিক ‘বিট’ সংরক্ষণ করা যায়, অর্থাৎ একটি ভক্সেল একাধিক তথ্য ধারণ করতে সক্ষম। কাঁচের ভেতরে অসংখ্য লেয়ারে এই ভক্সেল গুলো কলাম ও সারি আকারে সাজানো থাকে সব মিলে যা একে একটি ত্রিমাত্রিক আকার দেয়। এর ফলে ছোট স্থানেও অনেক বেশি পরিমাণ ডেটা রাইট করা যায়। সম্পূর্ণ সিস্টেমটি ত্রিমাত্রিক হবার কারণ শুধুমাত্র ভক্সেলের X, Y, Z অক্ষে অবস্থান, দিক ও গভীরতা নিয়ন্ত্রণ করে বহুমাত্রিক ডেটা সংরক্ষণ ডিভাইস তৈরি সম্ভব। একবার একটি শিটে ডেটা রাইট করা হয়ে গেলে সেটা সেখানে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয় এবং পরবর্তিতে শুধুমাত্র শিট থেকে রাইট করে ডেটা রিড করা যায়, কোন প্রকার মোডিফাই করার আর সুযোগ নেই। বিভিন্ন প্রযুক্তি দিয়ে কাঁচে ডেটা রাইট ও রিড করা সম্ভব। যেমন কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত মাইক্রোস্কোপ দিয়ে শিট থেকে ডেটা রিড করা সম্ভব, এটি ফেমটোসেকেন্ড পালস লেজারের মতই একটি লেজার রিডিং ডিভাইস যা কাঁচ থেকে ডেটা পুনরুদ্ধারে ব্যবহার করা হয়। X, Y, Z অক্ষে অবস্থান নির্ণয়ের মাধ্যমে দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্যের অবস্থান লেজার দিয়ে শনাক্ত করা হয়। এরপর রিডিং হেড (রিডিং লেজার পয়েন্টার) যে লেয়ারে তথ্যটি রয়েছে সেই লেয়ারে ফোকাস করানো হয়, সেই লেয়ারের ভক্সেল গুলোর পোলারাইজেশন (দিক) ও গভীরতা রেকর্ড করা হয়। এভাবে রিডিং হেড পরবর্তি লেয়ারগুলো স্ক্যান করে ও সবশেষে সবগুলো ছবি একত্রে প্রসেস করে সংরক্ষিত ডেটা উদ্ধার করা যায়।

প্রজেক্ট সিলিকার সুবিধাঃ

প্রজেক্ট সিলিকার সবথেকে বড় সুবিধা হল এতে রক্ষিত ডেটার জীবনকাল বা স্থায়িত্ব। কোয়ার্টজ কাঁচের শিট অত্যন্ত মজবুত এবং কাঁচের মধ্যে একবার ডেটা রাইট করা হয়ে গেলে সেই ডেটা সমৃদ্ধ কাঁচ শত শত বছর অক্ষত থাকতে পারে। অন্যান্য ম্যাগনেটিক স্টরেজের সবগুলোরই সময়ের সাথে সাথে কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়, সংরক্ষিত ডেটা ক্ষয় হয়ে যায়। কিন্তু কাঁচে এই ক্ষয়ের কোন ঝুঁকি নেই। বরং আরও বলা হচ্ছে ডেটা সংরক্ষিত কাঁচের লাইফটাইম ভার্চুয়ালি লিমিটলেস, কাঁচ ভেঙ্গে গেলেও এ থেকে সম্পূর্ণ ডেটা পুনরুদ্ধার সম্ভব। রক্ষিত ডেটা নষ্ট করার উপায় একমাত্র কাঁচকে গলিয়ে ফেলা বা ভেঙ্গে একেবারে গুড়ো করে ফেলা। যেহেতু সকল ডেটা কাঁচের ভেতরে রাইট করা, তাই বাইরের সার্ফেসে কোনভাবে স্ক্র্যাচ পড়লেও ভেতরের তথ্য সুরক্ষিত থাকবে। সাধারণ সিডি, ফিল্ম বা হার্ডডিস্কের ক্ষেত্রে যেটা সম্ভব না কারণ এসব সিস্টেমে ডিভাইসের বাহিরের তলেই ডেটা রাইট করা হয়।

প্রজেক্ট সিলিকার আর একটি বড় সুবিধা হল এর ইকোনমি। ম্যাগনেটিক স্টোরেজের তুলনায় এর উৎপাদন খরচ এবং ডেটা রিড-রাইট করার খরচ অনেক কম। এবং একটি কাঁচ শিটে মাত্র একবারই ডেটা রাইট করা যায় এবং সেখান থেকে তা হারিয়ে যাওয়ার কোন ভয় নেই।

প্রজেক্ট সিলিকা সম্পূর্ণ কাঁচের হবার কারণে এতে পানিতে ভেজার ভয় নেই, টেম্পারেচার কন্ট্রোলের ঝামেলা নেই এবং ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস থেকেও এর কোন ক্ষতি হবার ভয় নেই।

প্রজেক্ট সিলিকার সাফল্য ও বাস্তব প্রয়োগঃ

সম্প্রতি মাইক্রোসফট সফলভাবে প্রজেক্ট সিলিকার ট্রায়াল দিতে সক্ষম হয়েছে। এর জন্য মাইক্রোসফটের সাথে কাজ করছে পৃথিবীর অন্যতম বড় প্রোডাকশন হাউজ- ওয়ার্নার ব্রাদার্স। ওয়ার্নার ব্রাদার্সের কাছে পৃথিবীর সবথেকে বড় ফিল্ম ও টেলিভিশিন লাইব্রেরি রয়েছে যার সকল ডেটার গুরুত্ব শত শত বছরের থেকেও বেশি। ওয়ার্নার ব্রাদার্স বা এরকম অন্য সকল প্রোডাকশন হাউজ যখন কোন মিডিয়া প্রোডিউস করে তখন সেটা সংরক্ষণ করার চিন্তা শুধু মাত্র ২০ বছর বা ৫০ বছরের না বরং শত শত বছরের হয়ে থাকে। কারণ স্বাভাবিকভাবেই শত বছর আগে তৈরি করা কোন সিনেমা মানুষ সামনের আরও শত শত বছর দেখবে বা জেনারেশনের পর জেনারেশন সংরক্ষণ করে রাখবে। এই দীর্ঘ ডেটা সংরক্ষণের জন্য ডিজিটাল স্টোরেজ কোনভাবেই উপযোগি না। যার দরুন প্রোডাকশন হাউজগুলো তাদের সকল মিডিয়া কন্টেন্ট এখনও এনালগ স্টোরেজ বা ম্যাগনেটিক রিলে রাইট করে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সংরক্ষণ করে আসছে। ক্যালিফর্নিয়ায় রয়েছে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের দীর্ঘমেয়াদী ডেটা আর্কাইভ বা তাদের সকল মিডিয়া কন্টেন্ট সংরক্ষণের সুরক্ষিত ও গোপন লাইব্রেরি। এই অত্যন্ত গোপনীয় আর্কাইভের ভল্টে নিয়ণত্রিত তাপমাত্রা (৩০-৪৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) এবং ধূলাময়লাহীন পরিবেশে সংরক্ষিত আছে হাজার হাজার ম্যাগনেটিক রিল। বর্তমান সময়ে যদিও সকল কন্টেন্ট ডিজিটাল ভাবে রেকর্ড করা, কয়েক বছর আগেও সব ধরনের সিনেমা বা সিরিজ ফিল্ম ক্যামেরায় ধারণ করা হত। এই লাইব্রেরিতে রয়েছে সেইসব ফিল্মের কালেকশন। প্রজেক্ট সিলিকার জন্য ওয়ার্নার ব্রাদার্সের যে কন্টেন্টটিকে বাছাই করা হয় সেটা হল ১৯৭৮ সালের ‘সুপারম্যান’ মুভি। ২২ রিল ফিল্মের এই বিশাল সিনেমাকে মাত্র একটি ৭৫x৭৫ মিলিমিটার কাঁচের শিটে রাইট করা হয়। প্রথম প্র্যাক্টিকাল এপ্লিকেশন হিসেবে এই সিনেমাকে সিলেক্ট করার কারণ হল ৪০-এর দশকে ‘সুপারম্যান রেডিও শো’-কে গ্লাস রেকর্ডে আর্কাইভ করা হয়েছিল। প্রজেক্ট সিলিকায় সুপারম্যানের প্রায় ৭৬ গিগাবাইট রাইট করা হয়, সেই সাথে এতে আরও অতিরিক্ত ৩০ গিগাবাইট রাইট করা হয় এরর রিডানডেন্সি হিসেবে, যাতে করে কোথাও কোন সমস্যা হলেও সম্পূর্ণ মুভিকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়।

অবাক করার মত হলেও সত্য যে এখনও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে মিডিয়া স্টোরেজের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড হল ফিল্ম। কিন্তু এই ফিল্ম রিলগুলোকে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করার জন্য তাদেরকে বড় বড় ভল্টে নিয়ণত্রিত তাপমাত্রায় রাখা হয়। ফিল্মের অসুবিধা হল সরাসরি সূর্যের আলতেও এটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালসের ফলে (মাইক্রোওয়েভ) এতে রক্ষিত তথ্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে, ফিল্ম পানিতে ভিজলে নষ্ট হতে পারে আবার বেশি তাপ বা আগুনেও নষ্ট হয়ে যায়। আবার সেই সাথে এক একটি মুভিকে ধারণ করতে একাধিক রিলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রজেক্ট সিলিকা বা কাঁচে এত সব সমস্যার একটিও নেই। ফিল্ম লাইব্রেরিতে অগ্নি নিপার্বক হিসেবে পানি ব্যবহার করা যায়না কিন্তু পানি কাঁচের কোনই ক্ষতি করতে পারে না। উচ্চ বা নিম্ন তাপমাত্রাতেও কাঁচের গাঠনিক বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে যার ফলে অতিরিক্ত খরচ করে লাইব্রেরিতে টেম্পারেচার কন্ট্রোল করার কোন দরকার নেই। ওয়ার্নার ব্রাদার্সের মতে এটি এমন একটি প্রযুক্তি যা সত্যিকার অর্থে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘমেয়াদী ডেটা সংরক্ষণে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

৭৫x৭৫ মিলিমিটার আকারে প্রায় ১০০ গিগাবাইট রাইট করা হয়েছে, যা একটি সাধারণ মেমরি কার্ডের তুলনায় আকারে অনেক বড় কিন্তু ধারণ ক্ষমতায় অনেক ছোট। তাহলে মনে হতে পারে এর সুবিধা কোথায়। কিন্তু সিনেমার ২২টি রিলের সাথে যদি তুলনাকরা হয়, বা প্রতিষ্ঠানের বড় বড় ফাইল/খাতার সাথে যদি তুলনা করা হয় তাহলে এটি অনেক ছোট এবং অনেক বেশি সুবিধার।

কাদের জন্য প্রজেক্ট সিলিকাঃ

অবশ্যই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি প্রজেক্ট সিলিকার কেবল মাত্র একটি বাস্তব প্রয়োগ ক্ষেত্র। একইভাবে যেসব যায়গায় কাগজে তথ্য সংরক্ষণ করা হয় (বিভিন্ন দলিল বা নথিপত্র) সেখানেও পজেক্ট সিলিকা ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও অনেক ডেটা আছে আমরা যেগুলো দীর্ঘদিন অক্ষত রাখতে চাই, যেমন আমাদের জীবনের সকল স্মৃতি, ছবি, ভিডিও, অর্জন ইত্যাদি। আমরা সকলেই চাই আমাদের কর্ম, আমাদের সৃষ্টি বেঁচে থাকুক হাজার বছর, সেই স্বপ্ন পূরণে দরকার প্রজেক্ট সিলিকা। অর্থাৎ মোট কথা, আর্কাইভ ডেটার ক্ষেত্রে সিলিকন স্টোরেজের ভূমিকা সবথেকে বেশি, সেটা হোক প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন অথবা চলমান যুগের প্রয়োজন।

প্রাথমিক স্টেজে প্রজেক্ট সিলিকা ডেভেলপমেন্ট শুরু হয়েছিল ক্লাউড স্টোরেজ সল্যুশন হিসেবে। কারণ বর্তমানে ব্যবহৃত সকল স্টোরেজ মিডিয়ামের কোনোটাই অরিজিনালি ক্লাউডের কথা চিন্তা করে আবিষ্কৃত হয়নি, এবং দীর্ঘ সময় আর্কাইভ করে রাখা ডেটার জন্য এই স্টোরেজ সিস্টেম সুবিধার না। অবশ্যই এই প্রোজেক্ট সিলিকা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ডিভাইসে ইউজের জন্য উপযোগী না, এসব ডিভাইসে স্টোরেজের জন্য ন্যান্ড ফ্ল্যাশ বা ম্যাগনেটিক মিডিয়ার ব্যবহার আরও বহুদিন চলতে থাকবে। কারণ এসব ডিভাইসে রেগুলার ডেটা রিড-রাইট-রিরাইট করতে হয়। প্রজেক্ট সিলিকার এপ্লিকেশন আর্কাইভ ডেটার ক্ষেত্রে সবথেকে বেশি বলে ধারণা করছেন গবেষকরা। সেইসব তথ্য যেগুলো শত শত বছর অক্ষত অবস্থায় রাখা জরুরী এবং যাতে কোন রকম মোডিফিকেশনের দরকার নেই কখনও। যেমন বিভিন্ন দলিলপত্র, ছবি, মিডিয়া কন্টেন্ট (যেমন সিনেমা) ইত্যাদি।

সিলিকন স্টোরেজ সিস্টেমে হিটাচির অগ্রগতিঃ

২০০৮ সাল থেকে হিটাচি সুপার লং টার্ম ডেটা স্টোরেজ টেকনোলজি নিয়ে কাজ করছে। মাইক্রোসফটের পাশাপাশি হিটাচিও কাঁচের ভেতরে তথ্য সংরক্ষণ প্রযুক্তি গবেষণায় যথেষ্ট এগিয়ে এসেছে। হিটাচির রিসার্চে এই প্রযুক্তির নাম ‘ফিউজড সিলিকা রেকর্ডিং টেকনোলজি’। হিটাচি গবেষণায় দেখিয়েছে যে তাদের সংরক্ষণ করা তথ্য সম্বলিত ফিউজড সিলিকা স্টোরেজে ২ ঘন্টা যাবৎ ১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ দিলেও ডেটার কোন ক্ষয় বা নষ্ট হয়না। এই হিসাব অনুযায়ী ধারণা করা যায় যে সিলিকন স্টোরেজে সংরক্ষত তথ্য প্রায় ৩০০ মিলিয়ন বছর পর্যন্ত অক্ষত থাকতে পারে।

হিটাচির ভাষ্য মতে আমরা আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি, আমাদের জীবনধারা, আমাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করতে চাই। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী স্টোরেজ ডিভাইস, যা থেকে আবার সহজেই সংরক্ষণ করা ডেটা পুনরুদ্ধার করা যায়। কারণ সেই ডেটা বিষেশ কোন কাজের না যেটা পড়া অসম্ভব বা দূর্বোধ্য। এজন্য হিটাচির ফিউজড সিলিকায় রক্ষিত তথ্য সাধারণ অপটিকাল মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পড়া সম্ভব। মাইক্রোসফটের মত হিটাচিও ডেটা রাইটের ক্ষেত্রে ফেমটোলেজার ব্যবহার করে। ফেমটোলেজার দিয়ে ডাটা রাইটের এই প্রযুক্তি হিটাচি ও কিওটো ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মিলিত চেষ্টার ফল।

ফেমটো লেজার দিয়ে ডেটা রাইটিং এর এই প্রযুক্তির শুরুতে হিটাচি কাঁচের ভেতরে একটি লেয়ারে ফোকাস করে 2D কোড সংরক্ষণ করে। এই কোডকে পরবর্তিতে অপটিকাল মাইক্রোস্কোপ দিয়ে রিড করা যায় ও কম্পিউটারে দেখা যায়। এই মূলনীতির উপর ভিত্তি করে হিটাচি কাঁচের ভেতরে একাধিক লেয়ারে 2D ডেটা রাইট করার চেষ্টা করে। কিন্তু এক্ষেত্রে যে সমস্যাটা দেখা দেয় তা হল কাঁচের নিচের দিকের লেয়ারে ফোকাস করলে ফোকাসিং পয়েন্টের দৈর্ঘ্য বেড়ে যায়, যার ফলে তার উপরের লেয়ারের সাথে নয়েজ তৈরি হয়। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে হিটাচি তাদের ফিউজড সিলিকায় লেয়ারের সংখ্যা কমিয়ে সর্বোচ্চ ১০০টি লেয়ার করে সঠিকভাবে তথ্য সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়। এ পর্যায়ে হিটাচির এক একটি ফিউজড সিলিকা ডিভাইস বর্তমান সমএর এক একটি ব্লু-রে ডিস্কের সম পরিমাণ ডেটা সংরক্ষণ করতে সক্ষম।

হিটাচির এই প্রায় চিরস্থায়ী তথ্য সংরক্ষণের প্রযুক্তি খুব দ্রুত সকলের নজরে আসে এবং আরও অনেক কোম্পানি এই প্রযুক্তির উন্নয়ন কাজে যোগ দেয়। ২০১৪ সালে কম্প্যাক্ট আর্টিফিশিয়াল স্যাটেলাইট শিন-এন-২ এর পে লোডে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফিউজড সিলিকায় সংরক্ষিত তথ্য সম্বলিত একটি কাঁচের শিট হাজার হাজার বছর পরের এক অজানা ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে মহাকাশে পাঠানো হয়, সেই বার্তা আজও মহাকাশে ভ্রমণ করে চলেছে। ব্রিটিশ মিউজিয়াম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘১০০ জিনিসে পৃথিবীর ইতিহাস’ নামক প্রদর্শনী আয়োজন করে, যেখানে ২ মিলিয়ন বছরের ইতিহাস তুলে ধরা হয়। কোবে সিটির প্রদর্শনীতে হিটাচির ফিউজড সিলিকা রেকর্ডিং টেকনোলজিকে এই ১০০ আইটেমের একটি আইটেম হিসেবে সিলেক্ট করা হয়।

সবশেষেঃ

বর্তমানে প্রজেক্ট সিলিকা ও ফিউজড সিলিকা সহ আরও অনেক সিলিকন স্টোরেজ রিসার্চ স্টেজে আছে। গবেষকরা এর ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, রিড-রাইট স্পিড বৃদ্ধি এবং একে আরও উন্নত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। মাইক্রোসফটের কেমব্রিজ রিসার্চ ল্যাবে এই প্রজেক্টের সাথে কাজ করার জন্য যোগ্য ও আগ্রহী প্রার্থীদের মাইক্রোসফট বিভিন্ন পদে ইন্টার্নশিপ ও পোস্ট-ডক্টরিয়াল রিসার্চেরও সুযোগ দিচ্ছে। প্রজেক্ট সিলিকার পাশাপাশি ডিএনএ স্টোরেজ সিস্টেমেও গবেষনা চলছে করছে মাইক্রোসফটসহ আরও অনেক কোম্পানি। কাঁচের ভেতরে সুন্দর ডিজাইন করে যেসব শো-পিস আমাদের বাসার আশেপাশের গিফট শপে পাওয়া যায় এখন, কে জানে ভবিষ্যতে হয়তো আমরা এভাবেই কাঁচের ভেতরে আমাদের সকল তথ্য সংরক্ষণ করে রাখতে পারবো, চরদিনের জন্য, যা কখনও নষ্ট হবেনা, হারিয়ে যাবেনা, হাজার বছর পরেও হয়তো আমাদের কোন জেনারেশন (বা কোন এলিয়েন!) আমাদের নিয়ে বানানো কাঁচটি খুলে দেখবে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে।