শেয়ার

সম্প্রতি কিছুদিনের অন্তরে গুগল আর অ্যাপল ইসিম (eSIM) কে বিশ্ববাসীর সামনে অনেকটা নতুন করেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, তাদের লেটেস্ট কিছু ডিভাইসের মাধ্যমে ( গুগগুলের পিক্সেল ২ আর অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ৩ সেলুলার)। ইসিম-এর কনসেপ্ট অনেকদিন আগে থেকেই প্রযুক্তি বিশ্বে ভেসে বেড়ালেও অনেকেই এটা সম্পর্কে সঠিকভাবে ডিটেইলে কিছু জানতেন না, আর এখন পৃথীবির দুই শীর্ষস্থানীয় টেক জায়ান্ট যখন এই প্রযুক্তি ফাইনালি তাদের ডিভাইসে ইমপ্লিমেন্ট করেছে তো বলা যায় এখন সময় এসেছে ইসিম এর ব্যাপারে আরও একটু বিস্তারিতভাবে জানার।

সিম (SIM-Subscriber Identity Module) কার্ডে কিছু নেটওয়ার্ক স্পেসিফিক ইনফর্মেশন সংরক্ষিত থাকে যার মাধ্যমে একটা সেলুলার নেটওয়ার্কে একজন সাবস্ক্রাইবারের আইডেন্টিটি নিশ্চিত করা যায়। বিগত প্রায় ২৭ বছর ধরে এই প্রযুক্তি একটি চিপ সম্বলিত ফিজিক্যাল কার্ডের মাধ্যমে কঞ্জিউমার ওয়ার্ল্ডে প্রচলিত যেটাকে আমরা আমাদের মোবাইল ফোন/ সেলুলার ডিভাইসে প্রবেশ করিয়ে নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত হয়ে আসছি। প্রায় এই তিন যুগে প্রযুক্তি বিশ্ব অনেক সামনে এগিয়েছে, বলা যায় এই পরিবর্তন সিম কার্ডেও হয়েছে কিছুটা। সেই ১৯৯১ সালে যে সিম কার্ড মোবাইলে প্রবেশ করতে হত সেটার সাইজ ছিল বর্তমান সময়ের একটা ক্রেডিট কার্ডের সমান। তারপর থেকে সিম কার্ডের এই আকার অনেকাংশে কমেছে- মিনি সিম, মাইক্রো সিম, আর এখন ন্যানো সিম। কিন্তু এত আকৃতির পরিবর্তনের পরেও, এটা এখনও সেই চিপ সম্বলিত একটা কার্ড, মানে আসল প্রযুক্তি রয়ে গেছে সেই ২৭ বছর পেছনেই।

প্রযুক্তিবিশ্বে সকল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটা অন্যতম লক্ষ্য থাকে যেটা হল কিভাবে আরও আকারে ছোট, পাতলা আর হালকা ডিভাইস তৈরি করা যায় যেটা আবার ফিচার, কনফিগারেশন, ডিজাইনের দিক দিয়ে প্রিমিয়াম আর ফ্ল্যাগশিপ গ্রেড হবে। এই লক্ষ্য উদ্ধারের জন্যই স্মার্টফোন প্রযুক্তিতে এতকিছু সম্ভব হয়েছে এত তারাতারি, তৈরি করা হচ্ছে বেটার অলটারনেটিভ অপশন। যেমন আমাদের সবার প্রিয় হেডফোন জ্যাকও গায়েব হয়ে যাচ্ছে দিন দিন (যদিও আমি এটার পক্ষে, কারণ আমাদেরকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে, এই পথে প্রযুক্তির বদলটা স্বাভাবিক)।

এবার ফিরে আসা যাক সিম এর কথায়। সেই শুরু থেকে সিম কার্ডের সাইজ ছোট হয়েছে বলেই আমরা দিনে দিনে আরও ছোট আর হালকা পাতলা ডিভাইস পেয়েছি। কিন্তু আমাদের কাছে সিমের সাইজ অনেক ছোট মনে হলেও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইনারদের কাছে এই সাইজ মোটেও যথেষ্ট পরিমান ছোট না। সিমের সাইজ এখন ন্যানোতে এসে ঠেকলেও প্রযুক্তি বদল হয়নি বলে এই সিমের যায়গা করতেও ফোনে সিম ট্রে, ইন্টার্নাল সার্কটি প্লেসমেন্ট ইত্যাদি দিকে খেয়াল রাখতে হয়। অনেক বছর ধরে নির্মাতারা তাই বিভিন্নভাবে সিমের জন্য যায়গা করে ম্যাক্সিমাম প্রোডাক্টিভিটিতে পৌঁছাতে চেয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সময় তার থেকেও এগিয়ে। এখন আমাদের দরকার আরও হালকা, ছোট, পাতলা ডিভাইস কিন্তু সেই সাথে মজবুত, পানি নিরোধক ব্যাবস্থা। স্বাভাবিকভাবেই একটা ডিভাইসে যত কম ইনগ্রেস পয়েন্ট থাকবে সেটা তত ডিউরাবল আর উত্তম পানি রোধক হবে। ইন্টার্নাল ছাড়াও কার্ড ভিত্তিক সিমের ক্ষেত্রে আপনি যখন অপারেটর বদল করতে চান তখন আপনাকে সেই অপারেটরের অন্য কার্ড কিনে সেটা ব্যবহার করতে হবে, এটাও অনেক ঝামেলার প্রসেস আর যারা দেশ বিদেশে ট্রাভেল করেন তাদের জন্য তো আরও বেশি। এইসব সমস্যার সমাধান দিতেই উদ্ভাবন করা হয় ইসিম।

 

ইসিম (eSIM) কি?

eSIM এর e-এর মানে হল Embedded. আগে এটাকে eSIM না বলে eUICC বলা হত (embedded Universal Integrated Circuit Card)। এটা আকারে অনেক ছোট, দৈর্ঘ্যে আর প্রস্থে মাত্র ৫মিমি করে। এটা আর কোন কার্ড না, বরং একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ সিম সার্কিট যেটাকে ম্যানুফ্যাকচারের সময়ই ডিভাইসের মাদারবোর্ড বসিয়ে দেওয়া হয়, পরবর্তিতে যেটা যেকোন সিমকার্ডের মতই কাজ করবে। এটার মেশিন-টু-মেশিন আর রিমোট প্রভিশনিং ক্ষমতা আছে যা ফোন ম্যানেজমেন্ট, সাবস্ক্রাইবার আইডেন্টিফিকেশন, অথেন্টিকেটিং ইত্যাদিতে আরও উন্নত কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স নিশ্চিত করে। কারণ ইসিমের কল্যানে আমরা আমাদের ফোন সেটিংসের মধ্যে থেকেই আমাদের পছন্দের অপারেটর, তাদের প্ল্যান, ট্যারিফ ইত্যাদি সিলেক্ট করতে পারব। কোন সিম কার্ড কেনা, বদল করার ঝামেলা নেই। সাধারণ সিম কার্ডে যেমন কোন অপারেটরের স্পেসিফিক ইনফর্মেশন সংরক্ষিত থাকে সেভাবেই ইসিমে সব সংরক্ষিত থাকবে কিন্তু যেহেতু এটা বদল করা যাবেনা তাই এই সিমের সকল তথ্য অপারেটর কর্তৃক রি-রাইটেবল হবে। OTA এর মাধ্যমেই সকল অপারেটরের সকল তথ্য হালনাগাদ করা যাবে।

এই বছর মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসের জিএসএমএ সেমিনারে ইসিমের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর থমাস হেঞ্জ এই সিস্টেমের ডেমো দেখান। তিনি এক অপারেটরের কাছ থেকে পাওয়া ফিজিক্যাল এক লেটার থেকে ফোনে একটি কোড স্ক্যান করেন সেই অপারেটরের নেটওয়ার্কে সাবস্ক্রাইব করার জন্য।

ইসিমের ব্যাপারটা অনেকটা মোবাইল নাম্বার পোর্টেবিলিটির মত মনে হতে পারে। আসলেই অনেকটা সেরকম হলেও ফিজিক্যালি আর সার্বজনীনতার দিক দিয়ে ইসিম আলাদা। MNP তে সিম কার্ড ব্যবহার করা হয়, শুধু এক কার্ডে থেকে দেশের অন্য অপারেটরে সুইচ করা যায়। কিন্তু ইসিম কোন কার্ড না আর এটা শুধু কোন দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেনা। যেমন আপনি অন্য দেশে গেলে আপনার ফোন অটোমেটিক বুঝবে যে আপনি কোথায়, কোন দেশে, আপনার ফোনই তখন সেই স্থানের এভেইলেবল নেটওয়ার্ক আর তাদের প্ল্যান শো করবে, আপনি আপনার পছন্দ মত অপারেটর সিলেক্ট করবেন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই যদি ধরা যায়- দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইউজার গ্রামীনফোন আর বাংলালিঙ্ক এর। কিন্তু দেশেই এমন অনেক যায়গা আছে  যেখানে সকল অপারেটরের নেটওয়ার্ক নেই। দেখা যাচ্ছে শুধু রবি বা টেলিটক হয়তো আছে। এমন অবস্থায় আপনি আগে থেকে ব্যাপারটা না জানলেও আপনার ফোন নিজে থেকেই সব জানিয়ে দেবে আপনাকে। কষ্ট করে সিম নিয়ে বেরানো বা বদল করার আর কোন ঝামেলা থাকবেনা।

 

ইন্টারনেট অফ ডিভাইসেস

এতক্ষন শধু মোবাইল ফোনের কথা বলা হল। কিন্তু ধারণা করা হচ্ছে ইসিমের ব্যাপ্তি সকল কানেক্টেড ডিভাইসে হবে। যেহেতু এটা একটা বিল্ট ইন সার্কিট, কোন খোলা-লাগানোর ঝামেলা নাই সেহেতু এই প্রযুক্তি শুধু ফোনে নয়, খুব সহজেই স্মার্ট হোম, অটোমোবাইল, ল্যাপটপ, ঘড়ি, ইত্যাদি সকল ডিভাইসে ব্যবহার করা যাবে। যদিও বর্তমানে পরিধেয় ডিভাইসগুলো সচেয়ে বেশি লাভবান হবে এই প্রযুক্তি থেকে কিন্তু শিঘ্রই এটা বিস্তার লাভ করবে আমাদের অন্য সব ডিভাইসেও। ল্যাপটপ/কম্পিউটার  ইউজারদের সাথে সাথে অটোমোবাইল কোম্পানিগুলো/ইউজার লাভবান হবে ইসিমের মাধ্যমে সহজে তাদের গাড়িগুলোকে সেলুলার নেটওয়ার্কে কানেক্ট করে।

ধারণা করা হচ্ছে যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কানেকটেড ডিভাইস ক্যাটাগরিতে ‘Internet of Things’ ডিভাইসগুলো সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে, মোবাইলফোনের থেকেও। এই অগ্রগতিতে ইসিমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

 

ইসিমের ভবিষ্যত

স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় যে ইসিমই হল ভবিষ্যত। কিন্তু অবশ্যই এটা রাতারাতি বদলাবেনা। চারপাশে দেখুন, এখনও একটাও এরকম কোন আপনি ডিভাইস পাবেন না যেখানে ইসিম ব্যবহার করা হচ্ছে। এটা কেবল শুরু। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গুলো আস্তে আস্তে এই প্রযুক্তি তাদের ডিভাইসে ব্যবহার করা শুরু করবে। কেবল অ্যাপল আইপ্যড, ওয়াচ আর এদিকে গুগল পিক্সেল ২ এ আনা হয়েছে এই প্রযুক্তি। এটা এতই আর্লি স্টেজ যে পিক্সেল ২-এ ইসিম এর সাথে স্ট্যান্ডার্ড সিমকার্ড স্লটও রাখা হয়েছে। তো বলাই যায় এখন প্রায় অনেক বছর লেগে যাবে এই প্রযুক্তি সিম কার্ডের মত বহুল প্রচলিত হতে। সেই সাথে এর অনেক বড় একটা অংশ, আসলে সবচেয়ে বড় অংশই বলি, নির্ভর করছে আমাদের অপারেটরদের ওপর। তাদেরকে সম্মতি জানাতে হবে এই প্রযুক্তিতে, বিশ্বব্যাপী। থিওরেটিক্যালি এই প্রযুক্তি সবচেয়ে সুবিধার মনে হলেও এখন সবই অপারেটরদের হাতে। বাংলাদেশে তো এখনও MNP-ই চালু করেনাই অপারেটর, তাহলে এই প্রযুক্তির উদ্ভোধন কবে হবে সেটা নাহয় ধারণা করাই বাদ দিলাম আপাতত।

সেলুলার নেটওয়ার্কের বর্তমান স্ট্যান্ডার্ড সিমের ইতিহাস দীর্ঘ ২৭ বছরের হলেও এটা বলা যায় যে সিম কার্ড নিজে ইতিহাস হতে মানে নতুন স্ট্যান্ডার্ড ইসিম হতে ২৭ বছর লাগবেনা। প্রযুক্তি অনেক দ্রুত এগুচ্ছে। সকলের (নির্মাতা, অপারেটর, ইউজার) সাহস, উতসাহ আর সম্মতি থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই আমরা এই সুবিধা হাতের কাছে পাব বলে আশা রাখি।

মন্তব্যসমূহ